সোমবার । ৪ঠা মে, ২০২৬ । ২১শে বৈশাখ, ১৪৩৩
পেশা বদলাচ্ছেন শ্রমিকরা

খুলনার ১৬টি সিনেমা হল বন্ধ, খুঁড়িয়ে চলছে চারটি

মোহাম্মদ মিলন

এক সময় শিল্পনগরী খুলনার বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল সিনেমা হল। পিকচার প্যালেস, বৈকালি, সোসাইটি, স্টার, ঝিনুকের মতো জনপ্রিয় হলগুলো ছিল মানুষের আনন্দের ঠিকানা। কিন্তু সেই রমরমা দিন এখন কেবলই স্মৃতি। জেলায় এক সময় ২০টি সিনেমা হল থাকলেও বর্তমানে মাত্র চারটি কোনো মতো টিকে আছে। বাকিগুলো হয় ভেঙে ফেলা হয়েছে, না হয় রূপান্তরিত হয়েছে বহুতল ভবনে। আধুনিক সিনেপ্লেক্সের অভাব এবং পুরোনো হলগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা দর্শকদের ক্রমশ হলবিমুখ করে তুলেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া হলগুলোর মধ্যে রয়েছে খুলনার পিকচার প্যালেস, নিউ মার্কেট সংলগ্ন ঝিনুক, সোসাইটি, স্টার, দৌলতপুরের মিনাক্ষী, পাইকগাছার বাসরী, কপিলমুনির সোহাগ, চালনার সুন্দরবন, ডুমুরিয়ার শঙ্খমহল, ফুলবাড়ি গেটের জনতা, খালিশপুরের বৈকালি, বড় বাজারের উল্লাসিনী, গ্যারিসন, ফুলতলার শাপলা এবং রূপসার রূপসাগর সিনেমা হল। এগুলোর বেশিরভাগই প্রায় দেড় যুগ ধরে বন্ধ। বর্তমানে কোনোমতে চালু রয়েছে চিত্রালী ডিজিটাল সিনেমা হল, লিবার্টি সিনেপ্লেক্স, সঙ্গীতা ও শঙ্খ সিনেমা হল।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দর্শকের রুচি অনুযায়ী মানসম্মত সিনেমার অভাব, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা, উচ্চ বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে সিনেমা হলগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সিনেমা হল বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে এখানে কর্মরত শ্রমিকদের। গেটম্যান, প্রজেক্টর অপারেটর, ক্লিনার ও টিকিট কাউন্টার কর্মীরা দশকের পর দশক এই পেশায় জীবিকা নির্বাহ করেছেন। হল বন্ধ হওয়ায় তারা এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। বয়স্ক শ্রমিকদের পক্ষে নতুন কাজে যোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে বাধ্য হয়ে ইজিবাইক, ভ্যান বা রিকশা চালানো, খুচরা ব্যবসা, দিনমজুরি কিংবা হকারি করে সংসার চালাচ্ছেন।

বন্ধ হয়ে যাওয়া স্টার সিনেমা হলের প্রচারম্যান ও অপারেটর সিরাজুল ইসলাম বলেন, হল বন্ধের পর কিছুদিন ভাইয়ের ব্যাটারির ব্যবসায় সাহায্য করেছি। এখন ইজিবাইক চালাচ্ছি। স্টার হলে ১১ জন শ্রমিক ছিলেন। কেউ কেউ মারা গেছেন, বাকিরা মুদি দোকান বা রেন্ট-এ-কারসহ বিভিন্ন পেশায় ছড়িয়ে পড়েছেন। হল চালু থাকার সময় বেতনের পাশাপাশি বাড়তি আয়েরও সুযোগ ছিল।

তিনি আরও বলেন, ভালো গল্প ও শিল্পীর অভাব এবং ইন্টারনেটের প্রসারই হল বন্ধের মূল কারণ। তবে আধুনিক সিনেপ্লেক্স নির্মাণ হলে ব্যবসার সুযোগ আছে। বন্ধ হওয়া পিকচার প্যালেসের ম্যানেজার মুজিবর রহমান বলেন, হল বন্ধের পর শ্রমিক-কর্মচারীরা একেবারেই বেকার হয়ে পড়েন। পরে আমি একটি ইজিবাইকের শোরুম দিয়েছিলাম। কিন্তু ২০২২ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর থেকে বাড়িতেই আছি।

দৌলতপুরের মিনাক্ষী সিনেমা হলের সাবেক বুকিং ক্লার্ক নূর আলম বলেন, ১৯৯৪ সালে এই পেশায় যোগ দিয়েছিলাম। তখন হলে উপচে পড়ত দর্শক। ২০০৮ সালে ব্যবসায় মন্দা এবং মালিকের মৃত্যুতে হলটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দুই ভাই মিলে হলের নিচে একটি ফ্লেক্সিলোডের দোকান দিয়েছি। তিনজন অপারেটর মারা গেছেন। হলের নিরাপত্তাকর্মী এখন পথে পথে ঘুরে বেড়ান।

সঙ্গীতা সিনেমা হলের ম্যানেজার নাঈম বলেন, খুলনার ২০টি হলের মধ্যে মাত্র চারটি চলছে, তাও খুঁড়িয়ে। তেমন দর্শক আসেন না, সিনেমার খরচও ওঠে না। সঙ্গীতা চলছে ঠিকই, তবে যে কোনো মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আমি চাকরি ছেড়ে এখন ইলেকট্রিকের দোকান করছি। শ্রমিকরাও বেকার হয়ে বিকল্প পেশায় চলে গেছেন।

চিত্রালী ডিজিটাল সিনেমা হল পরিচালক তপু খান বলেন, সিনেমা হল চালানোকে কোনো পেশার মধ্যে ধরা হয় না। মানুষ এই পেশাকে ভালোভাবে দেখে না। আমার এখানে ৭ জন স্টাফ আছে, তারা এখন মানসিক এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। কারণ সিনেমার ভালো কনটেন্ট নেই, ভালো সিনেমা আসে না, হলগুলো জরাজীর্ণ। এদিকে সরকারের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। তাহলে এই স্টাফগুলো কীভাবে কাজ করবে? এর থেকে বাইরে কাজ করলে তারা ভালোভাবে চলতে পারবে।

তিনি বলেন, আমাদের খুলনায় হলগুলো চালু ছিল। ভালোভাবেই সবগুলো চলছিল। অধিকাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। আজকে প্রত্যেকটা হল নিভু নিভু অবস্থায়। তার মধ্যে চারটি হল কোনোভাবে চলছে। এখন আমার এই হলের অবস্থাও একই রকম। গেল ঈদে একটি সিনেমা এসেছিল, ভেবেছিলাম এই সিনেমা দিয়ে আমরা আরও কিছুদিন চলবো। কিন্তু ছবিটি ভালো না হওয়ায়, এক মাস ধরে চালানোর পরেও যে টাকা দিয়ে সিনেমা এনেছিলাম, সেই টাকাও তুলতে পারিনি। এভাবে চলতে থাকলে আমরা কীভাবে এই পেশায় টিকে থাকবো? এটা একটি সংস্কৃতি, একটি ঐতিহ্য। এই সিনেমা হল কীভাবে টিকে থাকবে?

তপু খান বলেন, বগত দুই বছরে তেমন কোনো সিনেমা নেই। এভাবে আমরা চলবো কী করে? এই হল বন্ধ করে এখানে অন্য কিছু করবো, সেখানেও তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সরকারের নিষেধ করেছে। সরকার বলছে, কোনো হল বন্ধ করা যাবে না। তাদের নির্দেশনা- শিল্প-সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে হলগুলো টিকিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু শুধু বাঁচিয়ে রাখতে বললে তো হবে না। আমি এইভাবে কীভাবে টিকে থাকবো, এর থেকে উত্তরণের কোনো উপায় নেই। একটি হল চালাতে গেলে কমপক্ষে সাত থেকে নয়জন লোক লাগে। এখানে যারা কাজ করে তারা অভ্যস্ত, তাদের অন্য কোনো অভিজ্ঞতা নেই। যার কারণে তারা এখন রিকশা বা ভ্যান চালাচ্ছে।

তিনি বলেন, ঈদে ছবির অপেক্ষায় আমরা থাকি। গত ঈদে একটি ছবি ভালো হয়েছিল, সেটি দিয়ে কোনো রকমে চলেছি। আবারও অপেক্ষায় আছি কবে একটি ভালো ছবি আসবে। এর থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। একসাথে যে সিনেমাগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলো হলে দিতে হবে। একজনকে দেবো, অন্যজনকে দেবো না- এটা হবে না। আমাদেরকেও দিতে হবে।

খুলনার ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটির সদস্য সচিব মহেন্দ্রনাথ সেন বলেন, একটি শহরের প্রাণ তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। সিনেমা হলগুলো শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু মালিকরা হল না চালিয়ে সম্পদ অন্য খাতে সরিয়ে নিচ্ছেন। এতে বিনোদন ও ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, আর বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে নতুন প্রজন্ম নিজস্ব শিকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তিনি মানসম্মত বাংলা সিনেমা নির্মাণ ও সিনেমা হলে প্রদর্শনের ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো হলগুলো আধুনিক সিনেপ্লেক্সে রূপান্তরের সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন